১৫ এপ্রিল, ২০২৬ হেমাটোলজিস্ট

থ্যালাসেমিয়া: বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান একটি চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং প্রতিরোধে স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব

থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) একটি মারাত্মক বংশগত রক্তজনিত ব্যাধি বা রোগ, যার কারণে মানুষের লোহিত রক্তকণিকায় হিমোগ্লোবিন উৎপাদনের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি গুরুতর রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ায় ভোগেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বাংলাদেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর হার দিন দিন বেড়েই চলেছে। সঠিক সচেতনতা এবং বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে এই নীরব ঘাতক রোগটিকে সমাজ থেকে নির্মূল করা সম্ভব।

হিমোগ্লোবিন হলো লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা একটি প্রোটিন, যা ফুসফুস থেকে সারা শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ করে। থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত মানুষের জিনগত ত্রুটির কারণে পর্যাপ্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হতে পারে না। ফলে লোহিত রক্তকণিকাগুলো দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়। রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিয়মিত বাইরে থেকে শরীরে রক্ত দিতে হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং মানসিকভাবে কষ্টদায়ক।

থ্যালাসেমিয়া রোগের প্রধান প্রধান উপসর্গসমূহ

থ্যালাসেমিয়া মেজর আক্রান্ত শিশুদের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

  • চরম রক্তাল্পতা ও ফ্যাকাশে ভাব: লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার কারণে শিশুর ত্বক ও শরীর অতিরিক্ত ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে।
  • শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া: আক্রান্ত শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি না পাওয়ায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি অনেক ধীর গতিতে হয়।
  • জন্ডিসের মতো লক্ষণ: লিভারের কর্মক্ষমতা কমে যাওয়া এবং প্লীহা (Spleen) বড় হয়ে যাওয়ার কারণে ত্বক ও চোখ হলুদ দেখায়।
  • হাড়ের বিকৃতি: রক্তকণিকার ঘাটতি মেটাতে হাড়ের মজ্জা অতিরিক্ত কাজ করায় মুখের ও মাথার হাড়ের গঠনে বিকৃতি দেখা দিতে পারে।

বিয়ের আগে পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং কেন জরুরি?

থ্যালাসেমিয়া সম্পূর্ণরূপে একটি জিনগত রোগ এবং এটি ছোঁয়াচে নয়। বাবা এবং মা উভয়েই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক (Carrier/Thalassemia Minor) হন, তবে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর (মারাত্মক রূপ) নিয়ে জন্ম নেওয়ার আশঙ্কা ২৫% থাকে। তাই বিয়ের আগে বা সন্তান গ্রহণের আগে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস (Hemoglobin Electrophoresis) পরীক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধের ৪টি মূল করণীয়:

১. প্রাক-বিবাহ রক্ত পরীক্ষা: বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার আগে পাত্র-পাত্রী উভয়ের রক্ত পরীক্ষা করা উচিত। দুইজন বাহকের মধ্যে বিয়ে এড়ানো গেলে পরবর্তী প্রজন্মে এই রোগ ছড়াবে না।
২. জেনেটিক কাউন্সেলিং: যদি কোনো পরিবারে আগে থেকেই থ্যালাসেমিয়া রোগী থাকে, তবে সন্তান নেওয়ার আগে অবশ্যই একজন চিকিৎসকের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে হবে।
৩. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও লোহা নিয়ন্ত্রণ: যারা থ্যালাসেমিয়া বাহক, তাদের নিয়মিত রক্তের হিমোগ্লোবিন পরিমাপ করতে হবে এবং শরীরে অতিরিক্ত লোহা (Iron) জমার হাত থেকে বাঁচার পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
৪. রক্তদানে অংশ নেওয়া: থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের জীবন বাঁচাতে নিয়মিত নিরাপদ ও স্ক্রিনড রক্তের প্রয়োজন হয়। তাই সুস্থ ব্যক্তিদের নিয়মিত রক্তদানে এগিয়ে আসা উচিত।

সুরক্ষা মেডিকেল সেন্টারের সেবা

সুরক্ষা মেডিকেল সেন্টারে উন্নত প্রযুক্তির ল্যাবরেটরি দ্বারা হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস ও থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং টেস্ট নিখুঁতভাবে করা হয়। আপনার একটু সচেতনতা পারে একটি ভবিষ্যৎ শিশুকে সুস্থ ও রোগমুক্ত জীবন দিতে। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করুন এবং থ্যালাসেমিয়ামুক্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তুলুন।

নিবন্ধটি শেয়ার করুন: