২০ এপ্রিল, ২০২৬ মেডিকেল টিম

ডেঙ্গু: প্রতি বছরই বাংলাদেশের অন্যতম বড় ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এর থেকে বাঁচার উপায়

ডেঙ্গু ভাইরাসের আক্রমণ বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী ও স্পর্শকাতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতি বছরই, বিশেষ করে মে থেকে অক্টোবর মাসের বর্ষা মৌসুমে এই রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে দেশের চিকিৎসা ও হাসপাতাল ব্যবস্থা এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো এই ডেঙ্গু রোগ অবহেলা করলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।

ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা মূলত স্ত্রী এডিস ইজিপ্টাই (Aedes aegypti) মশার কামড়ের মাধ্যমে মানবদেহে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। বর্ষাকালে বাড়ির আশেপাশে বৃষ্টির জমে থাকা পানি এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা এবং আমাদের চারপাশ পরিষ্কার রাখাই সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক।

ডেঙ্গু জ্বরের প্রধান প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ

মশার কামড় খাওয়ার সাধারণত ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুর লক্ষণ শরীরে প্রকাশ পায়। এর প্রধান উপসর্গগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

  • উচ্চ তাপমাত্রার জ্বর: ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান লক্ষণ হলো হঠাৎ করে ১০২ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত প্রচণ্ড জ্বর আসা, যা একটানা কয়েক দিন থাকতে পারে।
  • পেশি ও হাড়ের তীব্র ব্যথা: এই জ্বরে সারা শরীরে বিশেষ করে জয়েন্ট বা হাড়ের সংযোগস্থলে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, যে কারণে একে "হাড় ভাঙা জ্বর"-ও বলা হয়।
  • চোখের পেছনে তীব্র মাথাব্যথা: রোগীর তীব্র মাথাব্যথার পাশাপাশি বিশেষ করে চোখের গোলকের পেছনে তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।
  • রক্তের প্লেটলেট হ্রাস ও রক্তক্ষরণ: ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারের ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন স্থানে লালচে দাগ (র‍্যাশ), মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত এবং রক্তের প্লেটলেট দ্রুত কমে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়।

ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ

যেহেতু ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা বহুল ব্যবহৃত ও কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই একমাত্র সচেতনতা ও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার মাধ্যমেই আমরা এই রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারি।

আপনার ও পরিবারের সুরক্ষায় ৫টি জরুরি করণীয়:

১. তিন দিনে একদিন, জমা পানি ফেলে দিন: আপনার বাড়ির আশেপাশে থাকা টব, নারিকেলের খোসা, ভাঙা পাত্র কিংবা এয়ার কন্ডিশনারের ট্রে-তে জমে থাকা পানি নিয়মিত ৩ দিন পর পর পরিষ্কার করুন।
২. দিনে ও রাতে মশারি ব্যবহার: এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা, বিশেষ করে সকালে ও সন্ধ্যায় কামড়ায়। তাই ঘুমানোর সময় দিনে বা রাতে সবসময় মশারি ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. মশা তাড়ানোর ব্যবস্থা: ঘরে মশার কয়েল, স্প্রে অথবা অ্যারোসল ব্যবহারের পাশাপাশি শরীরে মসকিউটো রিপেলেন্ট ক্রিম লাগাতে পারেন। শিশুদের পুরো শরীর ঢাকা পোশাক পরিধান করানো উচিত।
৪. সামাজিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: শুধু নিজের বাড়ি নয়, প্রতিবেশীদের সাথে নিয়ে রাস্তাঘাট, ড্রেন ও অব্যবহৃত খালি জায়গাগুলো নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন যাতে মশা সেখানে বংশবৃদ্ধি করতে না পারে।
৫. প্রচুর তরল খাবার গ্রহণ: ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে প্রচুর পরিমাণে পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি ও লেবুর রস পান করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্যারাসিটামল ব্যতীত অন্য কোনো ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যাবে না।

কখন দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হবেন?

যদি রোগীর প্রচণ্ড পেটে ব্যথা, ক্রমাগত বমি হওয়া, মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, অত্যধিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্টের মতো বিপদচিহ্ন (Warning Signs) দেখা দেয়, তবে এক মুহূর্তও দেরি না করে রোগীকে নিকটস্থ হাসপাতালে বা সুরক্ষা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে আসতে হবে। আমাদের ল্যাবে ডেঙ্গুর গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা যেমন NS1 Antigen ও CBC টেস্ট দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা হয়।

নিবন্ধটি শেয়ার করুন: